
আমার এখনও মনে আছে ছোটবেলার সেই দুপুরগুলো, যখন বাসার কাঠের শেলফের পাশে উঠে বাবার পুরোনো অফিসের ডায়েরিগুলোর একটি নামিয়ে আনতাম, আর চুপচাপ একটি পাতা ছিঁড়ে বন্ধুকে চিঠি লেখার জন্য নিতাম। শুনতে যত সহজ লাগে, ব্যাপারটা কখনোই তত সহজ ছিল না। ডায়েরির পাতাগুলো ছিঁড়ে নেওয়ার জন্য তৈরি ছিল না। বেশি জোরে টান দিলে পাতাটা ঠিকমতো বের হতো না। কখনো অর্ধেক পাতা ভেতরে আটকে থাকত। কখনো বাঁধাই আলগা হয়ে যেত, আর পুরো ডায়েরিটাই যেন খুলে পড়তে শুরু করত। তখন মা দেখে ফেলতেন এবং আমাকে বকতেন।
কিন্তু সেই ডায়েরিগুলো সবসময়ই বাসায় থাকত। প্রতি নতুন বছরে বাবা অফিস থেকে একগাদা ডায়েরি নিয়ে আসতেন। কিছু ডায়েরির কাভারে ব্যাংকের নাম থাকত, কিছুতে ফার্মেসি বা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির লোগো থাকত, অনেকগুলোর প্রতিটি পাতায় ক্যালেন্ডার ছাপা থাকত। বেশির ভাগ ডায়েরিই কখনো পুরোপুরি ব্যবহার করা হতো না। এক-দুই পাতায় হয়তো ফোন নম্বর, বাজারের হিসাব, বা কারও ঠিকানা লেখা থাকত। বাকি পাতাগুলো মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর, শেলফে পড়ে ধুলো জমাত, অন্য কিছু হওয়ার অপেক্ষায় থাকত।
আমাদের কখনো নতুন লেখার প্যাড খুঁজতে যেতে হতো না। ডায়েরি থাকলেই যথেষ্ট ছিল। ডায়েরি না থাকলে আমরা খাতার পাতা ব্যবহার করতাম। সাদা পাতা থাকলেও সেটাও চলত। কিন্তু ডায়েরির পাতার নিজস্ব একটা ধরন ছিল। কখনো বছরটা অনেক আগের হয়ে যেত, কিন্তু কেউ তা নিয়ে ভাবত না। ১৯৯৮ সালের ডায়েরির একটি পাতায় ২০০৭ সালে লেখা একটি চিঠি অনায়াসেই থাকতে পারত।
এখন বাংলাদেশ ডিজিটাল। ফোন, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমেইল আর ফেসবুকে বার্তা মুহূর্তেই পৌঁছে যায়। উত্তরের জন্য কাউকে আর দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয় না। খামটা ঠিক মানুষের কাছে পৌঁছেছে কি না, সে চিন্তাও করতে হয় না। অনেক দিক থেকে জীবন সহজ হয়েছে। কিন্তু ডিজিটাল বার্তায় কারও হাতের চাপ থাকে না। কোথায় কলম থেমেছিল, কোথায় কালি গাঢ় হয়েছিল, কোথায় লেখক একটি শব্দ বদলেছেন বা একটি বাক্য মার্জিনের ভেতর গুঁজে দিয়েছেন, সেগুলো সেখানে দেখা যায় না।
কয়েক দিন আগে, এক বন্ধুর কাছ থেকে আমি হাতে লেখা একটি চিঠি পেয়েছিলাম। খাম খুলে শব্দগুলো পড়ার আগেই আমি হেসে ফেলেছিলাম। কাগজটি চেনা ছিল। সেটি ছিল একটি ডায়েরির পাতা, ওপরে ছাপা ক্যালেন্ডারসহ। হাতের লেখা সামান্য একদিকে হেলে ছিল। কিছু লাইন সোজা ছিল, কিছু ছিল না।

চিঠিটি দেখে আমার ছেলে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে কিছুক্ষণ ধরে সেটি হাতে নিয়ে পাতা উল্টেপাল্টে দেখছিল। তার কাছে জিনিসটি যেন প্রায় অন্য এক জগতের বস্তু মনে হচ্ছিল। সেদিন বিকেলেই পরে দেখলাম, শেলফের চারপাশে কয়েকটি ডায়েরি পড়ে আছে, টেনে বের করা এবং খোলা অবস্থায়। মাহী ডাইনিং টেবিলে বসে ছিল, একটি ডায়েরির পাতার ওপর ঝুঁকে, ভ্রু কুঁচকে, পুরো মনোযোগ দিয়ে আঁকিবুঁকি করছিল। আমি মনে মনে চুপচাপ হাসলাম। নিজের শৈশবে আমি যা অনুভব করেছিলাম, একটি পাতা বেছে নেওয়া, ভাঁজ করা, আর হাতে কিছু লেখার সেই ছোট্ট উত্তেজনা, আমার ছেলেও সেটাই অনুভব করছিল।
পাঠকের পাঠানো নিবন্ধ
নাজিমুদ্দিন হোসেন




