৫ আগস্ট ইতিহাস বদলে দেওয়া এক গণঅভ্যুত্থানের দিন- ডা: আব্দুল আহাদ

“ইতিহাস বদলে যায় রাতারাতি নয়, বদলে যায় সাহসিকতায়।” ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছিল তেমনই এক দিন—যেদিন ছাত্র, শ্রমিক ও জনতার ঐক্যবদ্ধ শক্তির কাছে নতজানু হয় একদা অপ্রতিরোধ্য বলে বিবেচিত স্বৈরশাসন। দিনটি এখন ইতিহাসে খোদাই হয়ে আছে “গণঅভ্যুত্থান দিবস” নামে। এই দিনে, দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা, গণআন্দোলনের মুখে দেশত্যাগে বাধ্য হন। এক নীরব বিদায়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পাট চুকিয়ে দেন এক ‘মজবুত’ অথচ বিতর্কিত শাসনব্যবস্থার।

‍আন্দোলনের সূচনা: একটি ছোট দাবির বিস্ফোরণ
সবকিছুর শুরু ছিল একটি ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত দাবি নিয়ে। ২০২৪ সালের ১ জুলাই, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজধানীসহ সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামেন। প্রথমে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মধ্যেই আন্দোলন সীমাবদ্ধ থাকলেও, তা দ্রুতই সহিংস দমন-পীড়নের শিকার হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিবর্ষণ, মধ্যরাতের ধরপাকড় এবং ছাত্রদের ওপর হামলা চলতে থাকে ধারাবাহিকভাবে।

এর পরপরই আন্দোলনের মুখ্য দাবি পরিবর্তিত হয়ে যায়—
“কোটা নয়, এবার একদফা: স্বৈরাচার পতন চাই!”

জুলাইয়ের উত্তাল রাজপথ
জুলাইজুড়ে রাজধানী ঢাকা পরিণত হয় মিনি যুদ্ধক্ষেত্রে। শাহবাগ, টিএসসি, প্রেসক্লাব, সায়েন্স ল্যাব, গুলিস্তান—প্রতিটি মোড়ে ছাত্র-জনতা অবস্থান নেয়। তাদের পাশে দাঁড়ায় পেশাজীবী সমাজ, শ্রমজীবী মানুষ, এমনকি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও সামাজিক মাধ্যমে শুরু করে তুমুল প্রচারণা। দেশের বাইরেও ধ্বনিত হয় “জাস্টিস ফর বাংলাদেশ” স্লোগান। জুলাই শেষে স্পষ্ট হয়, এই আন্দোলন আর কোনো একক দাবি বা সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি পরিণত হয়েছে জনতার বিদ্রোহে।

৫ আগস্ট: প্রতিরোধের চূড়ান্ত দিন
৫ আগস্ট সকাল। ঢাকা শহর কারফিউ জারির মধ্যে জড়ানো। মোড়ে মোড়ে সশস্ত্র পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি মোতায়েন। তবুও সকাল ৯টার পর, কারফিউ ভেঙে হাজার হাজার মানুষ বেরিয়ে আসে রাজপথে। শাহবাগ থেকে শুরু হয়ে মিছিল এগোয় গণভবনের দিকে। ছাত্রদের কাঁধে শহীদের রক্তাক্ত চিত্র, নারীদের হাতে পতাকা, শ্রমিকদের মুখে প্রতিবাদের স্লোগান—ঢাকায় দেখা যায় স্বাধীনতা-পূর্ব প্রতিবাদের প্রতিচ্ছবি। ঠিক দুপুর ১:৪০ মিনিটে গোপন পথে দেশ ত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। বিমানে ওঠার আগে গণভবনের প্রধান ফটক থেকে তার কনভয়ের শেষ দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে ঘোষিত হয়—শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। সে মুহূর্তে রাজপথে উল্লাসে ফেটে পড়ে লাখো মানুষ।

পরদিনের বড় ঘোষণা: সংসদ বিলুপ্তি
৬ আগস্ট দুপুরে বঙ্গভবন থেকে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়—দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এ সিদ্ধান্ত নেন সেনাবাহিনী প্রধান, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে মাত্র ছয় মাসের মাথায় ভেঙে যায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত একচেটিয়া সংসদ। গণতান্ত্রিক উত্তরণে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়।

শেখ হাসিনার শাসনামল: এক মূল্যায়ন
২০০৯ সাল থেকে ২০২৪—টানা ১৬ বছর ক্ষমতায় ছিলেন শেখ হাসিনা। যদিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে এই সময়, সমানতালে দমন-পীড়ন, দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপও চলেছে। বিশেষ করে ভারতের কূটনৈতিক সমর্থনে তিনি ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনের নামে প্রহসন, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের কারাবরণ, সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ—এইসব ঘটনা তাঁর শাসনকালকে ঘিরে বিস্তর বিতর্ক তৈরি করে।

৫ আগস্ট: শুধু দিবস নয়, এক চেতনার নাম
বর্তমান সরকার ৫ আগস্টকে “জাতীয় গণঅভ্যুত্থান দিবস” হিসেবে ঘোষণা করেছে। দিনটি উপলক্ষে দেশজুড়ে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল, শহীদদের স্মরণ, গণসংগীত, চিত্র প্রদর্শনী ও প্রতিবাদ কবিতা পাঠের আয়োজন হয়েছে।

প্রজন্মের কাছে এই দিবসের বার্তা স্পষ্ট—
“ভয় নয়, প্রতিরোধই মুক্তির পথ।”

একটি ছাত্র আন্দোলন থেকে যে দাবানলের শুরু, তা গড়িয়ে গেল সরকারের পতন পর্যন্ত। ৫ আগস্ট কেবল একটি ‘দিন’ নয়, এটি একটি প্রতীক—যে প্রতীক বলে দেয়, “জনতার শক্তি যখন জাগে, তখন ইতিহাস বাধ্য হয় পথ পাল্টাতে।” বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দিনটি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে সাহস, একতা ও প্রতিবাদের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে।

Recommended For You