
বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, কোটি মানুষের আবেগ, আনন্দ আর স্বপ্নের নাম। চার বছর পরপর যখন বিশ্বকাপের বাঁশি বাজে, তখন পৃথিবীর নানা প্রান্তের মতো বাংলাদেশেও শুরু হয় এক অন্যরকম উৎসব। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বকাপ ঘিরে সেই উন্মাদনার ধরন বদলেছে। প্রশ্ন হলো- আবেগ কি কমে গেছে, নাকি বদলে গেছে তার প্রকাশভঙ্গি?
একসময় বিশ্বকাপ মানেই ছিল গ্রামের চায়ের দোকান, শহরের মোড় কিংবা স্কুলের মাঠজুড়ে তুমুল আলোচনা। কে জিতবে, কার দল শক্তিশালী, কোন খেলোয়াড় সেরা—এসব নিয়ে চলতো দিনভর তর্ক-বিতর্ক। স্কুলের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে প্রিয় দল ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি কিংবা ইতালির পতাকা কেনার মধ্যে ছিল এক অন্যরকম আনন্দ। অনেকেই বাড়ির ছাদে, বাঁশের খুঁটিতে কিংবা গাছের ডালে ঝুলিয়ে দিতেন প্রিয় দলের বিশাল পতাকা। পুরো মহল্লা যেন ভাগ হয়ে যেত বিভিন্ন দেশের সমর্থকদের মধ্যে।
সেই সময় খেলা দেখার ব্যবস্থাও ছিল সীমিত। অনেক এলাকায় একটি টেলিভিশনকে ঘিরে কয়েকশ মানুষ একসঙ্গে খেলা উপভোগ করতেন। বিদ্যুৎ চলে গেলে মন খারাপ হতো, আবার ফিরে এলে উল্লাসে ফেটে পড়তেন সবাই। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ ছিল যেন একটি সামাজিক আয়োজন।
বর্তমান সময়ে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। প্রযুক্তির উন্নয়নে এখন খেলা দেখা যায় স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা ল্যাপটপে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে গোল, হাইলাইটস কিংবা বিশ্লেষণ। আগের মতো সবাই এক জায়গায় বসে খেলা না দেখলেও, ভার্চুয়াল জগতে সমর্থকদের উপস্থিতি অনেক বেশি। ফেসবুক পোস্ট, লাইভ আলোচনা, মিম কিংবা ভিডিও কনটেন্ট এখন বিশ্বকাপ উন্মাদনার নতুন ভাষা।
তবে পরিবর্তনের এই সময়ে কিছু বিষয় হারিয়েও গেছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে রাত জেগে খেলা দেখা, ম্যাচ শেষে চায়ের দোকানে আলোচনা কিংবা পতাকা টানানোকে কেন্দ্র করে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। ব্যস্ত জীবন, প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন এবং সামাজিক বাস্তবতার পরিবর্তন মানুষের উৎসব উদযাপনের ধরনও বদলে দিয়েছে।
তবুও বিশ্বকাপ এলে আজও হৃদয়ের কোথাও না কোথাও সেই পুরোনো আবেগ জেগে ওঠে। নতুন প্রজন্ম হয়তো টিফিনের টাকা জমিয়ে পতাকা কেনে না, কিন্তু তারা সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের সমর্থন প্রকাশ করে। তারা হয়তো মাঠে নয়, মোবাইলের পর্দায় খেলা দেখে; কিন্তু প্রিয় দলের জয়ে তাদের উচ্ছ্বাসও কম নয়।
বিশ্বকাপের একাল-সেকালের পার্থক্য তাই মূলত প্রকাশের ধরনে। আবেগের রঙ বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা আজও অমলিন। চার বছর পরপর বিশ্বকাপ এখনও কোটি মানুষের জীবনে এনে দেয় উৎসবের আমেজ, স্বপ্ন দেখার উপলক্ষ আর প্রিয় দলের জন্য নিরন্তর ভালোবাসার গল্প।
বিশ্বকাপের সেই পুরোনো দিনের স্মৃতি আর বর্তমানের ডিজিটাল উন্মাদনা- দুটোই আমাদের ফুটবল সংস্কৃতির অংশ। সময় বদলেছে, কিন্তু বিশ্বকাপের নাম শুনলে হৃদয়ে যে আলোড়ন ওঠে, সেটি আজও একই রয়ে গেছে।




